ফ্যাক্টচেকের নামে ভুয়া দাবি: যুবদল কর্মীর হত্যাকারী জামায়াতের সম্মেলনে ছিলেন, গিয়েছেন ছাত্রদলের মিছিলেও

 ফ্যাক্টচেকের নামে ভুয়া দাবি: যুবদল কর্মীর হত্যাকারী জামায়াতের সম্মেলনে ছিলেন, গিয়েছেন ছাত্রদলের মিছিলেও

বরগুনার পাথরঘাটায় যুবদল কর্মী নাসির হত্যাকান্ডে জড়িত হাসান ও রাব্বি নামের দুই ছাত্রলীগ কর্মীর জামায়াতের সমাবেশে অংশ নেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একপক্ষ দাবি করছেন ৫ আগস্টের পর এই দুই ছাত্রলীগ কর্মী এলাকায় ইসলামী ছাত্র শিবিরের ছত্রছায়ায় ছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে জামায়াতের একটি সহযোগী সদস্য সম্মেলনে তাদের অংশ নেওয়ার ছবিকে  উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে অন্যপক্ষ দাবি করছেন তারা জামায়াতের সেই সমাবেশে ছিলেন না। nnbd24.com নামের একটি পোর্টাল ফ্যাক্টচেক করে দাবি করেছে তারা জামায়াতের সমাবেশে অংশ নেননি বরং ছড়িয়ে পড়া ছবিটি অন্য কোন অনুষ্ঠানের। অনুরূপ দাবি ফেসবুকেও ছড়িয়েছে। ফ্যাক্ট অর ফলসের অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে ফ্যাক্টচেকটি যথাযথ হয়নি। অভিযুক্ত রাব্বি ও হাসানের ছড়িয়ে পড়া ছবি জামায়াতের সম্মেলনের ছিলো। রাব্বিকে এমনকি ছাত্রদলের মিছিলেও দেখা গিয়েছে।

পোর্টালটির ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে  সাংবাদিক শাহেদ আলমের পোস্ট করা ছবি বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয়েছে পাথরঘাটায় জামায়াতের সমাবেশের ছবিতে জামায়াত নেতার গলায় থাকায় ডেলিগেট কার্ডের ডিজাইন এবং রাব্বি ও হাসানের ছড়িয়ে পড়া ছবিতে তাদের গলায় থাকা ডেলিগেট কার্ডের ডিজাইন ভিন্ন।তবে আমরা যাচাই করে দেখেছি দুই কার্ডের ডিজাইন একই রকম। রাব্বি ও হাসানের ছবিটি সেল্ফি হওয়ায় এটির পাশ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। সেল্ফিতে সাধারণত ছবি ফ্লিপ করে পাশ পরিবর্তন হয়ে যায়। ফলে কার্ডের নিচে থাকা লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ উল্টে ‘ইসলামী জামায়াতে বাংলাদেশ’ হয়ে যায়। অস্পষ্টতার কারণে এটিকে অনেকে ’ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ মনে করেন। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সময় তোলা হাসানের একটি স্পষ্ট ছবি আমাদের হাতে এসেছে যেটিতে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ লেখা রয়েছে। এছাড়া উপরোক্ত প্রতিবেদনের শিরোনামে হত্যার শিকার নাসিরকে ছাত্রদল কর্মী বলা হয়েছে যেটি ভুল। মূলত নাসির যুবদল কর্মী ছিলেন।এছাড়া হাসানের পোস্ট করা একটি সেল্ফিতে প্যান্ডেলের সামিয়ানার রং ও জামায়াতের সম্মেলনের প্যান্ডেলের সামিয়ানার রং একই দেখা যায়।নাসির হত্যাকান্ডে জড়িত রাব্বি ও হাসানের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে গণমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদে তাদের ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার খবর এসেছে।  স্থানীয় বিএনপি নেতৃত্বের বরাতে ৫ আগস্টে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর তাদের শিবিরের ছত্রছায়ায় থাকার কথাও বলা হয়েছে। তবে আমাদের হাতে একটি ছবি এসেছে যাতে পাথরঘাটা পৌরসভা ৮ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রিয়াদের নেতৃত্বে ছাত্রদলের মিছিলে রাব্বিকে দেখা গিয়েছে।এ সংক্রান্ত একটি ফেসবুক পোস্টের নিচে মোহাম্মদ রিয়াদ মন্তব্য করেছেন, উন্মুক্ত মিছিলে কেউ আসতেই পারে তাকে তো বাধা দেওয়া যায় না। তবে আমরা তো আর জামায়াত-শিবিরের মতো প্লাকার্ড দিয়ে আনিনি, চেয়ারে বসতে দেইনি, খাবার খাওয়াইনি…(বানান সংশোধিত)।রিয়াদ এ ব্যাপারে একটি পৃথক ফেসবুক পোস্টে বলেন, “আওয়ামীলীগ এর পতনের পর কয়েকটি দিন সারা বাংলাদেশের সব জনতা বিজয় উল্লাস করেছে, সেখানে অনেক সুবিধাবাদীরা ও ছিল। এই ছবিটিও তার ই অংশ। এটা কোন রাজনৈতিক প্রোগ্রাম এর ছবি নয়। এখানে ছাত্রদল এর কোন ব্যানার,ফেস্টুন,প্লেকার্ড নেই। অতএব হীন রাজনৈতিক চরিতার্থ হাসিল করার জন্য এবং নিজেদের দায় এড়াতে একটি কুচক্রী মহল এই ছবিকে নিয়ে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক ভাবে আমার দলের সম্মান ক্ষুন্ন করছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাই।”প্রথম আলোর খবরে স্থানীয়দের বরাতে বলা হয়েছে হামলায় নেতৃত্বদানকারী রাব্বি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের স্থানীয় কর্মী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের খবরে পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক চৌধুরী ফারুকের বক্তব্য এসেছে এভাবে- “ঘটনায় জড়িত রাব্বি ও হাসান আগে ছাত্রলীগের কর্মী ছিল। এখন নাকি তারা শিবির করে। জামায়াতের একটি প্রোগ্রামে গিয়ে ছবি তুলেছে। তারা ছাত্রলীগ থেকে শিবির হয়ে আবারো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে।”

তবে বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে দেয়া পোস্টে হত্যাকারীদের ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী বলে দাবি করা হয়েছে।যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে বরগুনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইবরাহিম খলিলের বরাতে বলা হচ্ছে ঘটনাটি ব্যক্তিগত রেষারেষিতে ঘটেছে এবং বয়স কম হওয়ায় তারা নানা সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে চলাফেরা করেছে। পুলিশ সুপার বলেন, “অভিযুক্ত হাসান এবং রাব্বির বয়স খুবই কম এরা মূলত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চলাফেরা করতো। এ কারণেই কেউ কেউ তাদেরকে ছাত্রলীগ আবার কেউ তাদেরকে শিবির বলে দাবি করছেন।”

বরগুনা জামায়াত অভিযুক্তদের জামায়াত-শিবিরের সাথে যুক্ত থাকার দাবি অস্বীকার করেছে। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের বরগুনা জেলা শাখার আমীর অধ্যাপক মাওলানা মুহিবুল্লাহ হারুন লিখিত বক্তব্যে বলেন, “পাথরঘাটার একটি রাজনৈতিক দলের কিছু কর্মী ও নেতৃবৃন্দ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্থ করতে চাচ্ছে। এ কারণে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী বলে চাপিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য চেষ্টা চালানো হয়েছে।”