ইরানের সেনাপ্রধানকে পাক সেনাপ্রধানের ঘড়ি উপহার দেয়া নিয়ে গুজব

ফ্যাক্ট অর ফলস টিম

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি তথ্য প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের উপহার দেয়া একটি হাত ঘড়ি ইরানের সেনাপ্রধান মোহাম্মদ বাঘেরির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। । তবে, যাচাইয়ে দেখা গেছে দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি নিছকই একটি গুজব। আসিম মুনির মোহাম্মদ বাঘেরিকে কী ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন এবং ওই ঘড়িতে কোনো ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস ছিল কি না, এই সম্পর্কিত কোনো সরকারি বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণ বা তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

একাধিক ব্যবহারকারী ফেসবুক (, , , ) একই দাবিতে পোস্টটি শেয়ার করেছেন। আসিম মুনির ও মোহাম্মদ বাঘেরির ছবি পোস্ট করে বিবরণে লেখা হয়েছে, “পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের দেয়া উপহার হাত ঘড়ি কেড়ে নিয়েছে ইরানের সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরির প্রাণ। এতে সংযুক্ত ছিল মোসাদের ট্র্যাকিং ডিভাইস, যার ফলে সেনানিবাসের বাইরে স্ত্রী ও মেয়ের সাথে একান্ত সময় কাটানোর সময়ও তাকে খুঁজে পেতে ইসরাইলের কোনো সমস্যা হয়নি। এই হলো পাকিস্তান, এদের আপনি মুসলিম বলবেন?”

এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড ধরে অনলাইনে সার্চ করে দেখে ফ্যাক্ট অর ফলস। যাচাইয়ে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ জুন রাত ১০:২৩ মিনিটে এক্স (পূর্বের টুইটার) প্ল্যাটফর্মে @manamuntu নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে উক্ত দাবিটির সূত্রপাত ঘটে, যেখানে দাবি করা হয় যে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির ২০২৫ সালের ২৭ মে ইরানের মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরির সঙ্গে এক ব্যক্তিগত সাক্ষাতে একটি হাতঘড়ি উপহার দেন, যার ভেতরে নাকি একটি ইন্টারসেপ্টর বীকন লুকানো ছিল এবং সেটির মাধ্যমেই ইসরায়েল তাকে বিমান হামলায় লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়। 

পোস্টদাতার দাবি অনুযায়ী, এই তথ্য এমআই৬-এর গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে এসেছে বলে উল্লেখ করা হলেও, এর সঙ্গে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এটি সত্য যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি ২০২৫ সালের ২৭ মে তেহরানে একটি বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। বৈঠকে উভয় দেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। 

পাকিস্তানের আইএসপিআর (ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস) প্রেস রিলিজ বলছে, উক্ত বৈঠকে উভয় সামরিক নেতা সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধি, সামরিক সহযোগিতা জোরদার এবং দুই দেশের বর্ডার অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সংযোগের সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়। জেনারেল আসিম মুনির কে ইরানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয়।

তবে, কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়নি যে এই বৈঠকে উপহার বিনিময় হয়েছিল বা আসিম মুনিরের একটি হাত ঘড়ি জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরিকে  উপহার দিয়েছিলেন। যে দাবি করা হয়েছে যে, জেনারেল মুনিরের উপহারে একটি জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস ছিল, যা বাঘেরির অবস্থান ইসরায়েলকে জানাতে সাহায্য করেছে, তা সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। সামাজিক মাধ্যমে কিছু গুজব প্রচারিত হলেও, কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস বা সরকারি বিবৃতিতে এই দাবি সমর্থিত হয়নি। ইরান সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইসের কথা বলা হয়নি। 

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফস অফ স্টাফের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি ২০২৫ সালের ১৩ই জুন নিহত হন। আল জাজিরা, রয়টার্স (দ্য ডেইলি স্টার), এবং হিন্দুস্তান টাইমস এর মতো একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অনুসারে, ইসরায়েলের চালানো বিমান হামলায় তিনি মারা যান। এই হামলায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনা, এমনকি তেহরানের কিছু আবাসিক এলাকাও লক্ষ্যবস্তু ছিল, যেখানে উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বসবাস করতেন। ইসরায়েল এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম উভয়ই তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় তিনি ছিলেন ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা।

Facebook
LinkedIn
Twitter
Pinterest

সম্পর্কিত পোস্ট