ধর্ষণের অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ; বাংলাদেশি মিডিয়ার এ কেমন সাংবাদিকতা?

ফ্যাক্ট অর ফলস টিম

কুমিল্লার মুরাদনগরে এক যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক নারী। মামলার তথ্যমতে গত বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) ‘ধর্ষণের’ ঘটনটি ঘটে। দেশজুড়ে এখন এটি একটি আলোচিত ঘটনা। বিশেষ করে অভিযোগকারী নারী ও অভিযুক্তকে উলঙ্গ অবস্থায় কয়েক ব্যক্তির মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। এছাড়া বিএনপির সাথে অভিযুক্তের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রচার করায় এটি আরও বেশি আলোচনা তৈরি করে। যদিও পরবর্তীতে অভিযুক্ত যুবকের আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার প্রমাণ বেরিয়ে আসে।

রোববার (২৯ জুলাই) অভিযুক্ত যুবক ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার দায়ে আরও ৪জনকে আটক করেছে পুলিশ। যদিও কারো অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগে সে অপরাধী নয় এবং অভিযুক্তের নাম পরিচয় প্রকাশ করা ন্যায় বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে তদুপরি বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো সংবাদমাধ্যম প্রধান অভিযুক্তের নাম-পরিচয় ও ছবিসহ এ ঘটনার খবর প্রকাশ করেছে।

তবে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে রোববার দৈনিক নয়া দিগন্ত, কালেরকন্ঠ ও কালবেলা পত্রিকার প্রকাশ করা  ভিডিও প্রতিবেদনে। পত্রিকা দু’টির প্রতিবেদনে ধর্ষণের অভিযোগকারীর নাম, স্পষ্ট চেহারা  ও কন্ঠ অবিকৃত রেখে প্রকাশ করা হয়। যা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নয়া দিগন্ত কোন ব্যাখ্যা না দিয়ে ভিডিওটি তাদের ফেসবুক পেইজ থেকে সরিয়ে নিলেও ইতিমধ্যে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। পরবর্তীতে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভিডিওতে ওই নারীর চেহারা ব্লার করে প্রতিবেদনটি আবারও প্রকাশ করে নয়া দিগন্ত। তবে এবারও সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ওই নারীর নিজের নাম বলা অংশটি বাদ দেয়া হয়নি। কালবেলাও তাদের আগের পোস্টটি এডিট করে ভিডিওটি নতুন করে আপলোড করে যেখানে ওই নারীর চেহারা ব্লার করে দেয়া হয়। যদি পোস্টের ক্যাপশনে বিকেল ৫টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই নারীর নাম উল্লেখ করা ছিল। তবে আমরা এখানে তার চেহারা ঢেকে দিয়েছি ও নামের অংশটি মুছে দিয়েছি।

 

কালেরকন্ঠও ওই নারীর স্পষ্ট চেহারাসহ প্রকাশ ভিডিও প্রতিবেদনটি পরবর্তীতে সম্পাদনা করে চেহারা ব্লার করে দেয়। ব্লার করার আগের ছবি আমরা এখানে ঢেকে দিয়েছি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ -এর ১৪ ধারার উপধারা ১ এ বলা হয়, “এই আইনে বর্ণিত অপরাধের শিকার হইয়াছেন এইরূপ নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা তত্সম্পর্কিত আইনগত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা  [বা ছবি] বা অন্যবিধ তথ্য কোন সংবাদ পত্রে বা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমে [বা অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে] এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাইবে যাহাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।”

উপধারা ২ এ বলা হয়, “উপ-ধারা (১) এর বিধান লংঘন করা হইলে উক্ত লংঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকে অনধিক দুই বৎসর কারাদণ্ডে বা অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন ।”

অর্থাৎ বাংলাদেশের আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে ধর্ষণের শিকার নারীর নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয়। এই আইনের লঙ্ঘনের শাস্তি সর্বাধিক ২ বছরের কারাদন্ড অথবা সর্বাধিক এক লক্ষ টাকা জরিমানা।

২০২১ সালের ৮ মার্চ এই আইনের সক্রিয় প্রয়োগে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ জারি করে হাইকোর্ট। এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

আইনে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায়শই নির্যাতনের শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশ করে। বাংলাদেশের মিডিয়ার এমন আচরণ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ বা অন্য যৌন নির্যাতনের শিকার নারী পুনরায় সামাজিক কলঙ্কের শিকার হন। যা একজন যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর ভালোভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।

যেমন মুরাদনগরের ঘটনায় দৈনিক নয়া দিগন্ত ও কালবেলা পত্রিকার প্রতিবেদন ধর্ষণের অভিযোগকারী নারীর জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

Facebook
LinkedIn
Twitter
Pinterest

সম্পর্কিত পোস্ট