বিবিসি বাংলার খবরটি ভুল, প্রথমবারের মত ডাকসু নির্বাচন করছেনা শিবির

ফ্যাক্ট অর ফলস টিম

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা “স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের প্রার্থী ঘোষণা” শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা দিয়ে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এর আগে বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে শিবিরের পক্ষ থেকে গোপনে প্রার্থী দেওয়া হলেও প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি বলে সেই সময়ের ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন। অর্থাৎ সংবাদটি পাঠকের কাছে এমন ধারণা তৈরি করেছে যে, শিবির অতীতে কখনো খোলাখুলিভাবে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিবিসি বাংলার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।  

তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে এই তথ্যটি সঠিক নয়। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে একাধিকবার ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে। 

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ডাকসু নির্বাচনের কোনো স্থায়ী ধারাবাহিকতা তৈরি হয়নি। নিয়মিত নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়েছে মাত্র কয়েকবার। দীর্ঘ বিরতির পর অবশেষে ২০১৯ সালে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রশিবির প্রায় প্রতিটি ডাকসু নির্বাচনে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছিল। তবে ২০১৯ সালের নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারেনি। 

১৯৭৯ এবং ১৯৮০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির নিজস্ব প্যানেল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রনেতাদের বর্ণনা ও সেই সময়কার সংবাদপত্রে পাওয়া যায়। ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রথম প্যানেল গঠন করে ১৯৭৯ সালে তাহের–কাদেরের নেতৃত্বে। পরের বছর, ১৯৮০ সালেও তারা একই নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

 

১৯৮২ সালের নির্বাচনে প্যানেল দাঁড়ায় এনাম–কাদেরকে কেন্দ্র করে, সঙ্গে যুক্ত হন তোফাজ্জল, সাইফুল্লাহ, মুজাহিদ ও নাঈমদৈনিক যুগান্তর-এর একটি স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে উল্লেখ আছে, ১৯৮২ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অন্তত একটি পদে জয় পেয়েছিল।

 

১৯৮৯ সালের ডাকসুতে শিবিরের প্যানেল ফিরে আসে শামসু–আমিন–মুজিবের নেতৃত্বে। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনেও শিবির প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করে। ওই নির্বাচনে ভিপি পদে আমিনুল ইসলাম, জিএস পদে মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান এবং এজিএস পদে শফিকুল আলম হেলালকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে শিবির। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের মিথস্ক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম ‘পরিবেশ পরিষদ’ এর ১৯৯০ সালের এক বৈঠকে শিবির ও জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রসমাজকে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে না দেওয়ার বিষয়ে মতৈক্য হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ হলে সংগঠনটি দীর্ঘ সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনেও তাদের কোনো অংশগ্রহণ আর দেখা যায়নি। 

তবে গত বছরের আগস্ট সরকার পতনের পর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে শিবির আবার ক্যাম্পাসগুলোতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আসন্ন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচনের জন্য তারা প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে। সেই প্যানেলে নারী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

অতএব, বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে যে দাবি করা হয়েছে – শিবির আগে কখনো প্রকাশ্যে ডাকসু প্যানেল ঘোষণা করেনি – তা বিভ্রান্তিকর তথ্যগতভাবে ভুল। 

Facebook
LinkedIn
Twitter
Pinterest

সম্পর্কিত পোস্ট