বাউল নয়, চোর সন্দেহেই বায়তুল মোকাররমে যুবককে পিটুনির সূত্রপাত

ফ্যাক্ট অর ফলস টিম

শুক্রবার বাউল আবুল সরকারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। কর্মসূচীটির সমসাময়িক সময়ে একজন যুবককে গণপিটুনি দেন সমাবেশে অংশ গ্রহণকারীরা। 

ওই যুবককে কী কারণে গণপিটুনি দেয়া হয় তা নিয়ে দুই ধরনের দাবি প্রচারিত হতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কেউ কেউ দাবি করছেন বাউল সন্দেহে ওই যুবককে মারধর করা হয়, আবার অন্যরা বলছেন তাকে চোর সন্দেহ পিটুনি দেয়া হয়। 

বাউল সন্দেহের পক্ষে যারা পোস্ট করছে- দেখুন এখানে এখানে ,এখানে। এদিকে হেফাজতে ইসলাম এক বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছে, বাউল সন্দেহে নয়, বরং মোবাইল চোরকে গণধোলাই দিয়েছে উত্তেজিত জনতা। 

দৈনিক ইত্তেফাক বিকেলের দিকে ঘটনাটি নিয়ে তাদের ফেসবুক পেইজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে যার ক্যাপশনে ছিল “বাউল সন্দেহে যুবককে গ/ণপি/টুনি হেফাজত নেতাকর্মীদের”। ভিডিওটি প্রকাশের ৩ ঘন্টা পর পত্রিকাটি ক্যাপশন এডিট করে লিখে, “বায়তুল মোকাররম এলাকায় বাউল সন্দেহে যুবককে গ/ণপি/টুনি হেফাজত নেতাকর্মীদের”। এর ২ ঘন্টা পর পত্রিকাটি আবারও ক্যাপশন পরিবর্তন করে লিখে “বায়তুল মোকাররম এলাকায় চোর সন্দেহে যুবককে গ/ণপি/টুনি”। ভিডিওর ক্যাপশনের তথ্য পরিবর্তন করার বিষয়ে পত্রিকাটি কোন ঘোষণা দেয়নি। 

এছাড়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস “বাউল সন্দেহে পুরানা পল্টনে যুবককে গণপিটুনি” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, “ঢাকার পুরানা পল্টনে বাউল সন্দেহে এক যুবককে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। আজ শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) দুপুরে জুমার নামাজের পর পুরানা পল্টন কলেজের সামনে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী যুবকের পরিচয় জানা যায়নি।”

ইত্তেফাক ও ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিবেদন থেকেই বাউল সন্দেহে মারধরের দাবিটি ছড়ায়। 

তবে ইত্তেফাক যে ভিডিওটি প্রকাশ করে সেটির ১১ সেকেন্ডে দেখা যায় মারধরের শিকার যুবককে কলার ধরে টেনে আনছেন একজন হেফাজত কর্মী। এই সময় ওই হেফাজত কর্মীকে বলতে শোনা যায় (প্লেব্যাক স্পিড .৭৫) “মোবাইল ধরছে”। তিনি সাথে আরও কিছু বলছিলেন তবে তা স্পষ্ট শোনা যায়নি। মারধরের শিকার ব্যক্তি ওই সময় বলছিলেন, “আরে ভাই আমার দিকে পিক্কা মারছে।” এসময় উপস্থিত হেফাজত কর্মীরা ওই ব্যক্তি মারধর শুরু করেন। এক পর্যায়ে ওই ব্যাক্তি তাদের হাত থেকে ছুটে দৌড় দেন। বেশ কয়েকজন হেফাজত কর্মীও ধর ধর বলে তার পিছু নেন।

ভিডিওটির ১ মিনিট ৪ সেকেন্ডে শোনা যায় তার পিছু নেয়া লোকজনের মধ্য থেকে একজন বলছিলেন, “বাউল্যারে মার, ওই বাউল্যারে ধর।” ১ মিনিট ২০ সেকেন্ডে ভিডিও ধারণকারী জিজ্ঞেস করেন, “ভাই কী হইছে, হইছে কী?” তখন কেউ একজন জবাব দেন “বাউল, বাউল শিল্পী ধরা খাইছে।” এসময় ওই ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিতে থাকেন উপস্থিত হেফাজত কর্মীরা। তবে কয়েকজন হেফাজত স্বেচ্ছাসেবী তাকে মারধর থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তারা মারধরকারীদের নিবৃত্ত করতে সক্ষম হন।

ভিডিওটির ৩ মিনিট ৮ সেকেন্ডে দেখা যায় মারধরের শিকার ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেন, “প্রোগ্রামে ছিলাম, মোবাইল পিক্কা মারছে আরেক জনে।”

দ্য ডেল্টা লেন্স তাদের ফেসবুক পেইজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে ঘটনাটির। যখন মারধর চলছিল তখন পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে ডেল্টা লেন্স মারধরের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, কেউ বলে চোর, কেউ বলে বাউল। যে যেটা বলে ওটা বলেই মারতেসে।”

ইত্তেফাকের ভিডিওতে এই ব্যক্তিকেও মারধরের শিকার ব্যক্তির পিছু নিতে দেখা যায়।

ডেল্টা লেন্সের প্রকাশ করা ভিডিওটির ৪০ সেকেন্ডে দেখা যায় কয়েকজন হেফাজত স্বেচ্ছাসেবক মারধরের শিকার ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন এবং ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আমি চোর না।” এসময় একজন সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেন “আপনার হাত থেকে মোবাইল নিছে?” মারধরের শিকার ব্যক্তি জবাবে বলেন, না না আমার হাত থেকে মোবাইল নেয়নাই।”

ভিডিও দু’টি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় মূলত মোবাইল চু্রি সংক্রান্ত সন্দেহের বশেই ওই যুবককে মারধর শুরু হয়। তবে প্রথমবার মারধর থেকে ছুটে পালানোর সময় যেসব ব্যক্তি তার পিছু নেন তাদের মধ্য থেকে কেউ বাউল বলে হুজুগ তৈরি করেন এবং অনেকেই বাউল শিল্পী সন্দেহে তার পিছু নেন।  উপস্থিত জটলার মধ্যেও বাউল নাকি চোর সেটি নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়।

Facebook
LinkedIn
Twitter
Pinterest

সম্পর্কিত পোস্ট