ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড, এআই জেনারেটেড ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি জসীমউদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানভীর বারী হামিমের একটি ফেসবুক পোস্ট দাবিতে একটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
স্ক্রিনশটটির দাবিতে বলা হয়, হামিম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছেন “একজন আসছিলো এমপি হতে, তারা জায়গা মতোই পাঠানো হইছে। এখন মির্জা আব্বাসকে ঠেকায় কে?”
ওসমান হাদি ও মির্জা আব্বাসকে জড়িয়ে ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম এমন কোনো ফেসবুক পোস্ট করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে থাকা একটি পোস্টের লেখা বিকৃত করে আলোচিত ওই পোস্টের স্ক্রিনশট তৈরি করা হয়েছে।
হাদির ঘটনার প্রেক্ষিতে মির্জা আব্বাসকে উদ্ধৃত করে ও তার ছবি যুক্ত করে ‘জামাত-শিবিরের প্রশিক্ষিত শুটার দিয়ে হাদির কান লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে এবং গুলি হাদির কানের কাছ দিয়েই গেছে। আমি হাসপাতালে গিয়ে তাকে দেখে এসেছি। তার অবস্থা তেমন গুরুতর নয় তবে কানের সামান্য অংশ কেটে গেছে। অথচ, বট বাহিনী নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে এটাকে ভিন্ন ভাবে প্রচার করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।’ শিরোনামে একাধিক ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।
দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)
শরিফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বিষয়ে মির্জা আব্বাস এমন কোনো মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, কোনোপ্রকার তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আলোচিত মন্তব্যটি মির্জা আব্বাসের নামে প্রচার করা হয়েছে৷
শরিফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বিষয়ে মির্জা আব্বাসের মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এমন কোনো মন্তব্য করলে তা গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু, গণমাধ্যম কিংবা সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত কোনো সূত্রে আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো সংবাদ বা তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আরটিভির নাম ও লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়িয়ে ডিএমপি কমিশনার সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, ওসমান হাদির উপর গুলি বর্ষণকারী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত।
ফ্যাক্ট অর ফলস এর যাচাইয়ে দেখা যায়, আরটিভি এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। তাদের ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ও ওয়েবসাইট খুঁজে এই দাবিতে প্রচারিত কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি।
বরং ১৩ ডিসেম্বর তাদের ফেসবুক পেজে হাদি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের একই ছবি ব্যবহার করে প্রচারিত ভিন্ন শিরোনামে ‘হাদিকে গু/লি করা ব্যক্তিদের শ/না/ক্ত করে ফেলেছে পুলিশ: ডিএমপি কমিশনার।’ একটি ফটোকার্ড পাওয়া যায়।
প্রায় একই দাবিতে ফেসবুকে ছড়িয়েছে দৈনিক কালবেলার নামে ভুয়া ফটোকার্ড। এর মধ্যে কালবেলার নাম ও লোগোযুক্ত ফটোকার্ডটিতে লেখা, ‘ওসমান হাদির উপরে হামলায় জামায়াত শিবির জড়িত।’
দেখুন এখানে (আর্কাইভ)
ফটোকার্ডটিতে তারিখ দেওয়া ১২ ডিসেম্বর। এই সূত্রে কালবেলার ফেসবুক পেজ খুঁজে এমন কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। তাদের ওয়েবসাইটেও এমন কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
তবে একইদিনে কালবেলার ফেসবুক পেজে প্রচারিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়। এই ফটোকার্ডটির সঙ্গে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডের মিল পাওয়া যায়। এই ফটোকার্ডটির শিরোনাম, ‘ওসমান হাদির সর্বশেষ অবস্থা জানালেন চিকিৎসক।’
ওসমান হাদির ওপর গুলি করার ঘটনায় শনাক্তকৃত সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাথে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের চা পানের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
যাচাইয়ে দেখা যায়, ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় শনাক্তকৃত সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাথে সাদিক কায়েমের চা পানের ছবিটি বাস্তব নয়। প্রকৃতপক্ষে, দুই ব্যক্তির চা পানের ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।
ফেসবুকে ‘দশেরলাঠি – Dosherlathi’ নামের একটি পেজ থেকে চারটি ভিন্ন গণমাধ্যমের আদলে তৈরি আলাদা ফটোকার্ডের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে যে, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় শিবির জড়িত।
কালবেলার ডিজাইনে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘ওসমান হাদির উপরে হামলায় জামায়াত শিবির জড়িত।’
বাংলাদেশ টাইমসের ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ওসমান হাদির উপরে গুলি জামায়াত ‘শিশির’ করতে পারে জানিয়েছে ডিএমপি।
‘দ্যা ঢাকা ডায়েরি’র ডিজাইনে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ওসমান হাদির ওপর হামলার হুকুমদাতা ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। তারেক রহমানের দেশে আসা ঠেকাতে ওসমান হাদির উপরে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন।
আরটিভির আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, “ওসমান হাদির উপর গুলি বর্ষণ কারি জামায়াত – শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত : ডিএমপি কমিশনার।” একই দাবিতে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। দেখুন এখানে।
গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সেখান থেকে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে, ভারতবিরোধী অবস্থান নেওয়া হাদীকে বিগত সরকারের আমলে ভারত থেকে উপহার পাওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে হয়েছে দাবিতে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
ভারতের উপহার দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সে করে ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার দাবিটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, হাদিকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি ভারতের উপহার দেওয়া নয়। এটি ইতালি থেকে আমদানি করা ভিন্ন অ্যাম্বুলেন্স, যার সঙ্গে ভারতের উপহার দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সের পার্থক্য রয়েছে।
সম্প্রতি, ডাকসু ভিপি ও ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েমকে হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে দেখা গিয়েছে দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত ভিডিওটিতে সাদিক কায়েমকে একটি অ্যাশ কালারের মোটরসাইকেলে বসতে দেখা যায়।
ফ্যাক্ট অর ফলস এর যাচাইয়ে দেখা যায়, সাদিক কায়েমকে হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে দেখতে পাওয়া দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, হাদির ওপর হামলা ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং সাদিক কায়েমের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল দুটি ভিন্ন কোম্পানির। এছাড়াও হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি এবং সাদিক কায়েমকে বাইকে বহনকারী ব্যক্তিও এক নন।
আলোচিত দাবিটির বিষয়ে যাচাইয়ে হাদিকে হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের স্পষ্ট ছবি সংবলিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।
সিয়াম শাহরিয়ার নামক কথিত ডাক্তারের বরাতে ‘ওসমান হাদী আর বেঁচে নেই’ শীর্ষক একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।
যাচাইয়ে জানা যায়, ওসমান হাদি এখনো বেঁচে আছেন। উন্নত চিকিৎসা চলছে সিঙ্গাপুর।
‘সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী সাদেক কায়েমের পরিকল্পনায় হাদির উপর হাম/লা?’ শিরোনামে যমুনা টেলিভিশনের ডিজাইন সম্বলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে।
ফ্যাক্ট অর ফলস এর যাচাইয়ে দেখা যায়, ‘সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী সাদেক কায়েমের পরিকল্পনায় হাদির উপর হাম/লা?’ শিরোনামে যমুনা টেলিভিশন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, যমুনা টেলিভিশনের ফটোকার্ডের ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবিতে উক্ত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

