গোপালগঞ্জে সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পদযাত্রা ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এনসিপি নেতারা সমাবেশে যোগ দিতে গোপালগঞ্জে পৌছালে স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। সমাবেশস্থলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি ছোঁড়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এতে পাঁচজন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে।
এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যমে নানা গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে গোপালগঞ্জের সাম্প্রতিক সহিংসতা ঘিরে ছড়ানো বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার যেমন– মিথ্যা বক্তব্য, ভুয়া ফটোকার্ড এবং গুজবের সত্যতা যাচাই করা হয়েছে।
লাশ নিয়ে অপপ্রচার:
পাশাপাশি স্ট্রেচারে পড়ে থাকা নিথর তিন তরুণের একটি ছবি দিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দাবি করা হচ্ছে ‘গোপালগঞ্জে আরও লাশ’। তবে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা গেছে, ছবিটি ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তোলা হয়েছিল। সে সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় এই তিন তরুণ নিহত হন। ছবিতে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাঁদের একজন ছিলেন শহীদ ওয়াসিম আকরাম, যিনি চট্টগ্রামে কোটা আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত। ছবিটি তখন বিএনপির ফেসবুক পেজ ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
ইউটিবে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় অচেতন এক যুবককে পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছে। এই ভিডিওটি বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক একাউন্ট থেকে শেয়ার করে বলা হচ্ছে, “বর্তমান গোপালগঞ্জের অবস্থা” কিংবা “পুলিশ গুলি করে নিরস্ত্র এক বিক্ষোভকারীকে মেরে গাড়িতে তুলছে।” তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি গোপালগঞ্জের কোনো ঘটনার নয়, এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি পুরোনো ঘটনার দৃশ্য। ছিনতাইকারী সন্দেহে ওই ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাদুঘর বাজারে কোরবানির গরুর হাটে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।
“গোপালগঞ্জে হাসপাতালের বেড থেকে নামিয়ে সেনাবাহিনী ও এনসিপি-জামাত মিলে গণহত্যা চালিয়েছে।” ফেসবুকে এই দাবি সম্বলিত একাধিক পোস্ট ছড়ানো হয়েছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি ‘বিদ্যাপীঠ’ নামক একটি নাটকের দৃশ্য, যা ‘RKR Production’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। নাটকটির ১৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের সময় থেকে ভাইরাল ক্লিপের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। ‘বিদ্যাপীঠ’ নাটকটি তৈরি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে মোবাইল চুরির অভিযোগে মারধরের শিকার তোফাজ্জল নামের এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া সেই আলোচিত ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই নাটকটি নির্মিত।
ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হেলিকপ্টার থেকে নদী বা খালের পানিতে কিছু ফেলা হচ্ছে। এই ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, “হেলিকপ্টার থেকে গোপালগঞ্জে লাশ ফেলা হচ্ছে”। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের দৃশ্য, যা গত ফেব্রুয়ারিতে টিকটকে প্রকাশিত হয়।
একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি গণকবর খুঁড়ছেন। এটি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, “গোপালগঞ্জের গণহত্যার লাশের সংখ্যা সময়ের সাথে সাথে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, হত্যা ৫১ জন! নিখোঁজ ৩৯১ জন!” যাচাইয়ে দেখা যায়,ভিডিওটি মার্চে ফেসবুকে পোস্ট হয় এবং এতে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে মরদেহ দাফনের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এটি ২০২৪ সালের জুলাই–অভ্যুত্থানকালীন সময়ের বলে জানা যায়।
“পুলিশের গুলিতে আর্মি হতে চাওয়া জাবিরের মৃত্যু” দাবি করে সম্প্রতি একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়েছে। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, শিশু জাবির ইব্রাহিম সম্প্রতি নয়, গত বছর ৫ আগস্ট ঢাকার উত্তরায় আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এ ঘটনায় তখন প্রথম আলো সহ একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সুতরাং, তার মৃত্যু গোপালগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
“ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে গোপালগঞ্জ গণহত্যার লাশ”—এই দাবিতে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা গেছে, এটি গোপালগঞ্জের নয়, বরং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র জনতার আন্দোলনের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ। এই ভিডিও বিবিসি বাংলার ৯ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রথম আলোর ১৪ জানুয়ারির একটি প্রামাণ্যচিত্রে দেখা ফুটেজের সঙ্গে মিলে যায়।
অন্যান্য অবান্তর প্রচারণা:
“হাসনাত সারজিস গংদের ট্যাংকের ভিতরে নিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে বের হচ্ছে গুলি করতে করতে” শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। যেখানে দাবি করা হয়েছে, এনসিপির নেতাদের ট্যাংকে করে গোপালগঞ্জ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় সেনাবাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে তাদের নিয়ে গেছে। যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি গোপালগঞ্জের নয়। এটি তাইওয়ানের বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘হান কুয়াং ৪১’-এর একটি দৃশ্য, যা রাশিয়া-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম RT-এর এক্স হ্যান্ডেলে ১৫ জুলাই প্রকাশিত হয়েছিল।
একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা একটি ভবনে অভিযান চালাচ্ছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে যে এটি গোপালগঞ্জে যৌথ বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান। উক্ত দাবিতে একই ভিডিও শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কেও শেয়ার করতে দেখা যায়। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাম্প্রতিক গোপালগঞ্জ ঘটনার নয়। ভিডিওটি ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে বর্তমান গোপালগঞ্জ পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই।
“গোপালগঞ্জের মানুষের ধাওয়া খেয়ে নৌবাহিনীর পলায়ন”—এই শিরোনামে আরেকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। তবে যাচেইয়ে গেছে,ভিডিওটি গোপালগঞ্জের নয়, বরং মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে বালু উত্তোলন নিয়ে সংঘর্ষের পুরোনো ভিডিও। উক্ত ভিডিওর আসল উৎস চ্যানেল টোয়েন্টিফোর-এর ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ১৯ জুন প্রকাশিত “মুন্সিগঞ্জের মেঘনায় বালু উত্তোলন নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি” শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর ১ মিনিট ১৩ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ড সময়ের ফুটেজের সঙ্গে ভাইরাল ক্লিপটির হুবহু মিল রয়েছে। ঘটনাটি ছিল—সরকারি ইজারাকৃত বালুমহালের নির্ধারিত সীমার বাইরে বালু উত্তোলন করায় স্থানীয়দের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ। একই বিষয়ে যমুনা টিভির একটি প্রতিবেদন থেকেও একই ভিডিও ও তথ্য পাওয়া গেছে।
অস্ত্র উদ্ধারের একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে-“গোপালগঞ্জে মাটির নিচে লুকানো বিপুলসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।”তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি গোপালগঞ্জের নয় এবং সাম্প্রতিকও নয়। এটি ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী থানায় লুট হওয়া অস্ত্র সেনাবাহিনী উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের দৃশ্য। ভিডিওটি প্রথম ইনকিলাবের স্থানীয় সাংবাদিক শওকত হোসেনের ফেসবুকে প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনায় সেনাবাহিনী ১৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় ৪ হাজার রাউন্ড গুলি, নগদ অর্থ ও পুলিশের পোশাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে—যা একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
লাঠি হাতে একটি শিশুর ছবি বা শর্টস ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ে গোপালগঞ্জে ধারণ করা। যাচাইয়ে দেখা গেছে, ছবিটি গোপালগঞ্জের নয় এবং সাম্প্রতিকও নয়। ছবিটি ২০২৪ সালের আগস্টে গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় ধারণ করা একটি ভিডিওর স্ক্রিনশট। ওই ভিডিওতে শিশুটির পোশাক ও পরিবেশ ভাইরাল ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। গুগল স্ট্রিটভিউ বিশ্লেষণে সেটি বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমির পাশের এলাকা হিসেবে শনাক্ত করা গেছে।
২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনে হামলার ছবিকে গোপালগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনার বলে প্রচার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র পদযাত্রা ঘিরে হামলা ও সংঘর্ষের দৃশ্য দাবি করে এই ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়। যাচাইয়ে দেখা গেছে, ছবিগুলো ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তোলা, যেখানে আন্দোলনকারীদের ওপর যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ হামলা ও গুলিবর্ষণ করে।
তসলিমা নাসরিন এবং আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের পেইজ ও প্রোফাইল থেকে দাবি করা হয়, গোপালগঞ্জে ভ্যানে করে নেয়া লাশ এবং পুলিশের হাতে আটক ব্যক্তি একই। প্রকৃতপক্ষে এরা ভিন্ন ব্যক্তি। আটক ব্যক্তি জয় এবং ভ্যানে নেয়া নিহত ব্যক্তির নাম রমজান কাজী। দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে, একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর ও ডিজিটাল ফুটেজ বিশ্লেষণে স্পষ্টই দুজনের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।
সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ‘শোভন’ নামের এক সৈনিক ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জ সহিংসতার প্রতিবাদে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, শোভন সৈকত নামের ওই ব্যক্তি গোপালগঞ্জের ঘটনার ছয় দিন আগে, অর্থাৎ ১০ জুলাই, ব্যক্তিগত কারণে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন—যা তিনি নিজেই ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে ভাইরাল দাবি খণ্ডন করে তিনি জানান, “আমি গোপালগঞ্জের ঘটনার অনেক আগেই রিজাইন দিয়েছি, দয়া করে গুজবে কান দেবেন না।”
কয়েকজন অস্ত্রধারী ব্যক্তির প্রশিক্ষণরত ছবি শেয়ার করে ফেসবুকে দাবি করা হচ্ছে, এটি গোপালগঞ্জে ‘মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং’-এর দৃশ্য। তবে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা গেছে, ছবিটি বাংলাদেশের নয় এবং সাম্প্রতিকও নয়। ছবিটি ২০১২ সালের ৮ জুলাই ছত্তিশগড়ের বিজাপুরে মাওবাদীদের একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে ধারণ করা হয়, যা AFP সূত্রে বিবিসি, ইন্ডিয়া ডট কম ও অন্যান্য ভারতীয় গণমাধ্যমে মাওবাদী বিষয়ক প্রতিবেদনে ফাইল ফটো হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।















