পিনাকী ভট্টাচার্যের ছড়ানো কয়েকটি অপতথ্য

ফ্যাক্ট অর ফলস টিম

প্রবাসী ভ্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য বহুদিন ধরেই ইউটিউবে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণমূলক ভিডিও বানিয়ে আসছেন। এছাড়া সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তিনি সমানতালে সরব। তার বানানো ভিডিও কন্টেন্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া পোস্ট নিয়মিতই ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে তার ভক্ত ও সমালোচকদের মাঝে। তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্লেষণ হাজির করতে গিয়ে অপতথ্য ছড়াতেও দেখা গেছে তাকে।

এমনই ৫টি অপতথ্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। 

গত ২৩ নভেম্বর ২০২৪ এ পিনাকী ভট্টাচার্য এর ইউটিউব চ্যানেলে “মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ঝাঁকি হবি ঝাঁকি || Pinaki Bhattacharya || The Untold” শিরোনামে একটি ভিডিও আপলোড করে। ভিডিওটির ৫ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে একটি ভিডিও এড করে পিনাকী দাবি করছেন আওয়ামীলীগ অফিসের সামনে হোন্ডা আর গুন্ডা এনে মিছিল করছে।

ফ্যাক্ট অর ফলস এর যাচাইয়ে দেখা যায়, শহীদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচিকে প্রতিহত করতে গত ৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কের নেতৃত্বে স্লোগানের দৃশ্যের, যেখানে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। উক্ত স্লোগানের অডিও ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে মুছে দিয়ে তাতে শেখ হাসিনার পক্ষের স্লোগানের অডিও যুক্ত করা হয়

প্রচারিত ভিডিওটির একাধিক কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে Hasib Al-islam এর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ১০ নভেম্বর প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়, “জনতার ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাই। | মুজিববাদ মুর্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।।” উক্ত ভিডিওটির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির হুবহু সাদৃশ্য পাওয়া যায়। 

পাশাপাশি, উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ভিডিওটিতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক বাকের মজুমদারের নেতৃত্বে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। এসময় ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরো দেব রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, “সাঈদ ওয়াসিম মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ স্লোগানসহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়। স্লোগানটির সাথে ভিডিওটিতে প্রদর্শিত ব্যক্তিদের মুখভঙ্গির সাথেও সাদৃশ্য পাওয়া যায়, অপরদিকে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির স্লোগানের সাথে স্লোগানরত ব্যক্তিদের মুখভঙ্গির বৈসাদৃশ্য পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে সমন্বয়কদের স্লোগানের অডিওটি ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনা করে ভিন্ন একটি অডিও যুক্ত করা হয়েছে।

গত ৪ নভেম্বর নতুন রাজনৈতিক দল হিসাবে ইসির নিবন্ধন না পাওয়ায় আমজনতা দলের সদস্যসচিব তারেক রহমান আমরণ অনশনে বসেছিলেন। দীর্ঘ ১৩৮ ঘণ্টা অনশনে ছিলেন। গত ৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তারেকের অনশন ভাঙান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, আমজনতার তারেক অনশনের সময় লুকিয়ে খেয়েছিলেন। প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, পিলার সদৃশ বস্তুর পেছনে তারেক রহমান খাবার খাচ্ছেন। তার হাতে ক্যানুলা লাগানো।

ভিডিওটি Pinaki Bhattacharya – পিনাকী ভট্টাচার্য পোস্ট দিয়ে ক্যাপশনে লিখেছেন, “আমি একি হেরিলাম!! আপনারা কী দেখতে পারছেন কিছু?” যেটি এখন পর্যন্ত ১২ হাজার শেয়ার হয়েছে।

উক্ত দাবিতে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)

ফ্যাক্ট অর ফলস এর যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি বাস্তব নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই এর সাহায্যে তৈরি।

ফ্যাক্ট অর ফলস “আমজনতার তারেকের অনশনে লুকিয়ে খাওয়ার ভিডিওটি এআই জেনারেটেড” শিরোনামে একটি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে।

ভিডিওটি এখনও তার প্রোফাইলে রয়েছে তিনি ডিলিট করেনটি।

গত ১৪ নভেম্বর ২০২৫ পিনাকী ভট্টাচার্য  “সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের মূর্তি ভাঙচুর; মির্জা ফখরুলের নিন্দা জ্ঞাপন” শিরোনামে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস এর ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করেছেন।

ফ্যাক্ট অর ফলস এই বিষয়টিও যাচাই করেছে এবং “সোহরাওয়ার্দীতে শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় মির্জা ফখরুল নিন্দা জানাননি” শিরোনামে একটি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ফ্যাক্ট অর ফলস এর যাচাইয়ে জানা যায়, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস উক্ত শিরোনামে কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি বরং ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় গণমাধ্যমটির ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনার মাধ্যমে এই ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

তাছাড়া, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমেও জানিয়েছে যে, আলোচিত ফটোকার্ডটি ভুয়া।

আলোচিত ফটোকার্ডটি পিনাকী ভট্টাচার্য তার প্রোফাইল থেকে সরিয়ে ফেললেও তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেননি।

গত ১২ অক্টোবর ২০২৫ পিনাকী ভট্টাচার্য তার প্রোফাইলে সেনাবাহিনীর ক্যু নিয়ে ভিডিও বার্তাসহ বেশ কয়েকটি পোস্ট করেন।

পোস্টে দাবি করেন, “সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের কিছু অস্বাভাবিক মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে। যেকোন ক্যু দেতার প্রচেষ্টা রুখে দিন। প্রয়োজনে রাজপথে নেমে আসুন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে। সকল মাদ্রাসা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ভাই বোনেরা জনতাকে সাথে নিয়ে রাজপথের দখল নিন। সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসার আর সৈনিকদের আহবান জানাই আপনারা দুর্বৃত্ত জেনারেলদের ক্রীড়নক হবেন না।”

অন্য আর এক পোস্টে আহ্বান জানান যে, “এখুনি ছাত্রাবাস থেকে নেমে আসুন ছাত্র ভাই বোনেরা। মাদ্রাসা থেকে নেমে আসুন। রাতেই। ভোরের আলোর অপেক্ষা না করে। আমরা দেখিয়ে দেবো। বিপ্লব জিন্দা আছে।”

দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)

কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় কোন ক্যু সংঘটিত হয়নি এবং এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটেনি।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ১০ ডিসেম্বর ১২৫টি আসনে মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। দলটির পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন পায় সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য একটি পোস্টে দাবি করেন, এনসিপির মনোনয়নপ্রাপ্ত মনজুর কাদের আওয়ামী লীগের শাসনামলে ধানমন্ডি ক্লাব দখল করে এর নাম পরিবর্তন করে ‘শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব’ করেন।

পিনাকী তার পোস্টে আরও দাবি করেন, এনসিপির মনোনীত মনজুর কাদের ক্লাব দখলের পাশাপাশি দীর্ঘ ৯ বছর ক্লাবটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি ক্লাবের গভনিং বডির চেয়ারম্যান হওয়ার সাথে সাথে ততকালীন আওয়ামী সরকার থেকে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা লাভ করে প্রচুর সম্পদের মালিক হন। 

পিনাকী ভট্টাচার্যের করা ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্ট অর ফলস বিষয়টি ইতোমধ্যে “ভিন্ন মনজুর কাদেরকে এনসিপির প্রার্থী দাবি করে অপতথ্য ছড়ালেন পিনাকী” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে ফ্যাক্ট অর ফলস নিশ্চিত হয়েছে, এনসিপির প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের এবং শেখ জামাল ক্লাবের সভাপতি মনজুর কাদের একই ব্যক্তি নন। 

সিরাজগঞ্জ -৫ আসনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদেরের ধানমন্ডি ক্লাব দখল কিংবা ক্লাবটির সভাপতির দায়িত্ব পালনের দাবিগুলো সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সাবেক সভাপতি মনজুর কাদের এবং  সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের পৃথক দুইজন ব্যক্তি। মেজর (অব.) মনজুর কাদের পূর্বে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও ধানমন্ডি ক্লাব দখল সংক্রান্ত দাবিগুলোর সাথে তার সংশ্লিষ্টতা নেই।

শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সাবেক সভাপতি মনজুর কাদের এবং সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের পৃথক দুইজন ব্যক্তি। দুই মনজুর কাদেরের চেহারার বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।

পিনাকী ভট্টাচার্য এনসিপির প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের সম্পর্কে যে দাবি করেছেন যে তিনি শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সভাপতি ছিলেন এবং পতিত সরকারের সহযোগী ছিলেন সেটি সঠিক নয়। অর্থাৎ এক মনজুর কাদেরের তথ্য অন্য মনজুর কাদেরের নামে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন পিনাকী ভট্টাচার্য।  

পোস্টটি পিনাকী ভট্টাচার্য পরবর্তীতে এডিট করেছেন কিন্তু পূর্বে ভুল তথ্য উপস্থাপন করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেননি।

Facebook
LinkedIn
Twitter
Pinterest

সম্পর্কিত পোস্ট